আমি ও আমার অতুলনীয় মা —লিখেছেনঃ সাগরিকা সুলতানা | বিভাগঃ মায়ের গল্প | বাসায় ফিরছি, হঠাৎ খেয়াল হলো আমার মুঠোফোন অবিরাম বেজে চলেছে। সেদিকে নজর পড়তেই ব্যাগ থেকে বের করে দেখি মা জননীর কল। অনেক ভিড় বাহিরে ইচ্ছে করলেও উপায় ছিলো না সেই কল রিসিভ করা। তাই সেভাবেই রেখে বাসায় চলে আসলাম। বাসায় সবে ঢুকেছি তখন আবারো বেজে উঠলো মোবাইলফোন। ফোনটি রিসিভ করতেই আমার বুকের মধ্যে হু হু করে উঠলো। হাত পায়ে একটা অবশ ভাব অনুভব করলাম। মনে হলো চারিদিক কেমন যেন শুন্য হয়ে আসছে। আর এসব ঘটেছে মায়ের কান্নার শব্দে। মা তো কখনো এভাবে কাঁদে না। মনের মধ্যে শংকা উপস্থিত হলো। “কি হয়েছে মা, তুমি কাঁদছ কেনো?” প্রতিউত্তরে শুধু মায়ের বিরতিহীন কান্নায় আমার কর্ণপটে বাঁধতে লাগলো। আবারো জিজ্ঞেসা করলাম “মা কি হয়েছে? আমাকে কেন বলছো না? কেঁদো না, প্লিজ আমাকে বলো’ তখন মা একটু সামলে নিয়ে বললো “হঠাৎ তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে, সেই সকাল থেকে তোর জন্য মনটা ছটফট করছে। তুই তারাতারি বাড়িতে চলে আয়, আমার আর ভালো লাগছে না”। এই কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার মায়ের কান্না। গত ৩ বছর মা’কে ছাড়া এই ব্যস্ততম নগরীতে জীবন অতিবাহিত করছি। ভাবতেই কেমন যেন অবাক লাগে !! যে আমি মাকে ছাড়া কয়েক মুহূর্ত থাকতে নারাজ আজ সে কি না হাজার দিনেরও বেশি সময়ের আংশিক সময় বাদে সম্পূর্ণ সময়ই মা’কে ছাড়া কাটিয়েছি!! বড়দের কাছ থেকে শুনেছি এটাই নাকি বাস্তবতা। এভাবেই নাকি জীবন গাড়ি চালিয়ে যেতে হয়। যুগ যুগ ধরে নাকি আমার মত সবাইকেই একসময় মা বাবা ছেড়ে থাকতে হয়। আজ মায়ের জন্য খুব কস্ট হচ্ছে। তাই নিজের কিছু কথা তার জন্য লিখতে ইচ্ছা করছে। যদিও জানি মা’কে নিয়ে লিখতে কোন ধরাবাধা উপমার প্রয়োজন হয় না, কিংবা সময় নিয়ে ভেবে ভেবে কাগজ নষ্ট করতে হয় না। মা’কে নিয়ে লেখা সম্পূর্ণ চলে আসে নিজের অন্তর থেকে। দেহের রক্ত প্রবাহই বলে দেয় মায়ের কথার উচ্চারণ। প্রতিটি নিঃশ্বাসেই থাকে মায়ের ভালোবাসার চাদর মোড়ানো। পরিবারের ৩ সদ্যসের মধ্যে আমিই একমাত্র আমার বাবা মায়ের আদরের কন্যা। একমাত্র কন্যা হিসাবে তাই অন্যদের চেয়ে আমার আদরও বেশি, আবার আবদার ও বেশি। আমার এটা লাগবে, ওটা লাগবে, আমি এটা করবো না, ওটা করতে পারবো না … এমন অনেক হরেক রকমের শব্দ সব সময় আমার মুখ থেকে বের হতো। একদিন হঠাৎ আমার নানু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি তখন স্কুলে, মা আমাকে না জানিয়েই দ্রুত নানুদের বাড়িতে রওনা হলেন। আমি স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি মা বাড়িতে নেই। আর যাবে কোথায় !! শুরু করে দিলাম অঝোরে কান্না। সেরকম কান্না এর আগে আমি আর কখনো করিনি। আমার মা তার মায়ের বাড়ীতে গিয়েছে তাতে আমার কষ্ট নেই, কিন্তু যখন আমি ভাবছি যে আজ রাতে আমার মায়ের সাথে ঘুমাতে পারবো না তখনই বুক ফেটে কান্না বের হচ্ছে। অবশেষে সেই কান্না থামলো পরের দিন নানুদের বাড়ীতে গিয়ে মায়ের কোলে উঠে। মা যে কি অমূল্য ভালোবাসার স্থান তা আবারও বুঝতে পেরেছিলাম যখন ঢাকায় প্রথম আসি। সবে হোস্টেলে উঠেছি। পড়ালেখা করতে হলে তো কিছু ছাড় দিতেই হবে তাই মনকে অনেক বুঝিয়ে রেখেছি যাতে কষ্ট না পায় মায়ের জন্য। কিন্তু বিধিবাম ! ১৫ দিন যেতে না যেতেই মায়ের জন্য বুক ভারী হয়ে উঠলো। একা একা সারারাত কাঁদলাম। তাও মন শান্ত হয় না। এমন এক সময় তখন যখন এমন কেউ নেই যে আমাকে সেই সুদুর বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। আমি ঢাকা থেকে কখনই একা বাড়িতে যাইনি তাই আরো বেশি মনে কষ্ট পাচ্ছিলাম। অবশেষে আমার খালাকে বলে ২ দিন পর বাড়ীতে গিয়ে উঠলাম। বাড়িতে গিয়েই মায়ের বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে সব কষ্টকে দূর করার চেষ্টা করলাম। এমন কয়েকটি রাত আমার জীবন থেকে গিয়েছে যে ঘুমের মধ্যে আমি প্রচুর ছটফট করেছি। চোখ দিয়ে পানি বের হয়েছে। মাঝরাতে অন্ধকারে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে একলা ঘরে শুন্যতায় ভুগেছি। এই ছটফট হয়েছে মায়ের জন্য। মাকে নিয়ে দুস্বপ্ন দেখার পরেই এমন অবস্থার তৈরি হয়েছি। তখন মনে হয় যেভাবেই হোক মায়ের কাছে চলে যাই, মায়ের মুখটা ভালো করে দেখি, মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমাই। কিন্তু কি আর করা। এই ব্যস্ত নগরীর কোন ফুসরত নেই তার বুকে বসবাসরত প্রাণীদের বিরাম দেয়ার। সেই রাতের কান্না এই নগরীর অন্ধকার আর নিস্তব্ধতায় দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে যায়। তো শুরুতে যেখানে ছিলাম। সেদিনের সেই মায়ের কান্না আমার মনে এমন ভাবে নাড়া দিয়েছিলো যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। ওইদিন আমার কথা চিন্তা করে মায়ের রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিলো। শেষে এমন অবস্থা হয়েছিলো যে ডাক্তার বাড়ি না যাওয়া পর্যন্ত তা ঠিক হয় নি। ২ এক দিনের মধ্যে মা সুস্থ হলেন। তখন আমি মাকে বললাম “আচ্ছা মা তুমি এমন পাগল কেনো? এভাবে আমাদের জন্য কেন দুশ্চিন্তা করো?” তখন মা বলে উঠলেন “আজ বুঝবি না। যেদিন মা হবি সেদিনই বুঝতে পারবি বুকের ধন যদি দূরপরবাসে থাকে তাহলে মায়ের বুকের মধ্যে কেমন হাহাকার করে” সত্যিই মা, তুমি ঠিক বলেছো। একজন জননী হবার আগেই যদি তোমার জন্য এমন কষ্ট লাগে তাহলে একজন মা এর কত কষ্ট লাগতে পারে তা কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারছি। বাড়ি ছেড়ে না এলে বুঝতেই পারতাম না আমি আমার মা’কে এতো এতো ভালোবাসি। আর কিছুদিন পড়েই দীর্ঘ ৯ মাস পড় মায়ের মুখ দেখবো। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাবো। ইসসস আর তর সইছে না। মনে হচ্ছে আজই চলে যাই মায়ের কাছে। কত দিন মায়ের হাতের রান্না খাই না। সেই সব ভর্তা, ভাজির কোন তুলনা হয় না। আমি জানি আমার মা ও অনেক পথ চেয়ে আছে আমার জন্য। আসলে পৃথিবীর সকল মাই অতুলনীয়, অভাবনীয়, অমূল্য। পুস্তকের কোন বিশেষণ দিয়ে আসলে মা নামটিকে সজ্জিত করা যাবে না। কারন তারা সকলেই এই একটি শব্দের কাছে তুচ্ছো!! মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি
Thursday, 2 June 2016
Author: bdlove
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.
0 coment rios:
Post a Comment