পরিবারের নারীদেরকে এই সামান্য সহযোগিতাও ইবাদত। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা একটি স্বতন্ত্র ও অনেক বড় নেক আমল। আর মাহে রমজানে তো যে কোনো নেক আমলের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অন্য মাসের চেয়ে বেশি। এই মর্মে কোরআন বলছে, “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠিন।”(সূরা মায়েদা, আয়াত ২) রমজানে দুপুরের সময়টা খুবই ক্লান্তির সময়। এসময় বড় ধরনের কাজ না থাকলে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা একটু আরাম করে থাকেন। নিয়মিত যাদের অফিস করতে হয় তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু এসময়টাতেই নারীদের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা। ইফতারির আয়োজন থেকে নিয়ে ঘরবাড়ি পরিস্কার করা পর্যন্ত সমস্ত কাজ গৃহিণীকেই দেখতে হয়। রোজার দীর্ঘ উপবাসের কারণে শারীরিক অবসাদ ও ক্লান্তিবোধ পুরুষের যেমন হয় নারীদেরও হয়। এসময় নারীরা অন্যের একটু সাহায্য-সহযোগিতা ও সহমর্মিতা পেলে খানিকটা হলেও স্বস্তি পায়। মানসিক আনন্দ-তৃপ্তি অনুভব করে। এসময় আমাদের পরিবারগুলোতে পুরুষ সদস্যরা গৃহিণীর সঙ্গে একটু সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারেন। গৃহিণীর কাজকে হালকা করে দিতে পারেন। পরিবারের নারীদেরকে এই সামান্য সহযোগিতাও ইবাদত। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা একটি স্বতন্ত্র ও অনেক বড় নেক আমল। আর মাহে রমজানে তো যে কোনো নেক আমলের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অন্য মাসের চেয়ে বেশি। এই মর্মে কোরআন বলছে, “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠিন।”(সূরা মায়েদা, আয়াত ২) হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের পার্থিব কষ্টসমূহের একটি দূর করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর অভাবের কষ্ট লাঘব করে, আল্লাহ তায়ালা তার দুনিয়ার ও আখেরাতের অভাবের কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ তায়ালা বান্দার সহয়তায় থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সহায়তায় থাকে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৮) সুরাইয়া বিনতে শরিফ
Saturday, 28 May 2016
ভালো বাবা মায়ের সন্তান নষ্ট খারাপ হতে পাড়ে কেন
মোটা কথা, কাউকে ধিক্কার দেয়া এবং কারও পাপের কারণে তাকে লজ্জা দেয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার ছিলো। এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল সা.-এর হাদিস মনে এসে গেলো— কোনো ব্যক্তি কাউকে যদি তার পাপের কারণে লজ্জা দেয়, তবে মৃত্যুর পূর্বে নিজেই সেই পাপে সে জড়িয়ে পড়বে। নবি করিম সা. বলেছেন— কারও বিপদে খুশি হলে আল্লাহ তায়ালা তার দোষ গোপন রাখবেন না। ইসমাঈল সাহেব যদিও আলেম ছিলেন না, কিন্তু অত্যন্ত ধর্মভীরু, তাহাজ্জুদগোজার ছিলেন এবং নিয়মিত জামাতে প্রথম তাকবিরের সঙ্গে নামাজ আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন। তার সর্বমোট ছয়টি সন্তান ছিলো। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি যে পরিমাণে কষ্টকর অস্থিরতা ও যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন, তা ছিলো কেবল সন্তানদের জন্যে প্রচ- দুশ্চিন্তা। তার তিনটি সন্তানের বিয়ে হয়েছিলো। কিন্তু ছেলেরা ছিলো এখনও অবিবাহিত। এদের মধ্যে দুটি ছোটো ছেলে তাদের জন্যে দুর্নামের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তারা উল্টাসিধা ও ভবঘুরের মতো হয়ে গিয়েছিলো এবং পুরো মহল্লা ও এলাকার অধিবাসীরা তার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলো। দ্বিতীয় ছেলেটি সীমাহীন দুর্নামের অধিকারী হয়ে গিয়েছিলো। এই সন্তানদের বাবা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেঁদে কেঁদে বলতে থাকেন— হে আল্লাহ, আমার মনে পড়ছে না, আমি জীবনে এমন কী পাপ করেছি, যার কারণে আমাকে আজ এমন দুর্দিন দেখতে হচ্ছে। তার সমবয়সীরাও বলছিলো যে, তিনি ছেলেবেলা থেকেই সজ্জন ও ভালো মানুষ ছিলেন। সবসময় হারাম-হালাল বাছবিচার করে চলতেন। কখনো মাদক, ব্যভিচার ও জুয়াবাজির ধারেকাছেও ভেড়েন নি। একদিকে এমনই ছিলো তার ইতিবাচক অবস্থা, আর অন্যদিকে তার সন্তানদের নেতিবাচক পরিস্থিতি। এই কঠিন প্যাঁচের গেড়ো খুলছিলো না। কয়েকজন ব্যক্তি তার ব্যাপারে গভীর পর্যবেক্ষণ করলেন। এ ক্ষেত্রে সমকালীন এক বুজুর্গ সাহায্যে এগিয়ে এলেন এবং বিষয়টি শীঘ্রই বোঝা গেলো। তার বুজুর্গ সঙ্গীর বক্তব্য ছিলো— যৌবনকালে মসজিদে যাওয়ার সময় যখন দুষ্ট ছেলেরা তার সামনে পড়তো, তাদের তিনি ধিক্কার দিতেন যে, তোদের কোন বদমাশ বাবা জন্ম দিয়েছে রে? তোদের বাবা কি হারাম রোজগার করে আর সেগুলো তোদের খাওয়ায়, যার কারণে তোদের এই দুরবস্থা হয়েছে? স্বজনদের কারও কোনো নেতিবাচক, অপছন্দনীয় ও অবিশাসযোগ্য কথা যদি কানে আসতো, তবে তিনি সবার সামনে মন্তব্য করতেন যে, ইতরদের সন্তান ইতরই হয়ে থাকে। এই ছেলেদের বাবাও যুবক থাকতে এমন কোনো কাজ করে থাকবে। এ জন্যেই তার ছেলেদের এই অবস্থা হয়েছে। মোটা কথা, কাউকে ধিক্কার দেয়া এবং কারও পাপের কারণে তাকে লজ্জা দেয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার ছিলো। এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল সা.-এর হাদিস মনে এসে গেলো— কোনো ব্যক্তি কাউকে যদি তার পাপের কারণে লজ্জা দেয়, তবে মৃত্যুর পূর্বে নিজেই সেই পাপে সে জড়িয়ে পড়বে। নবি করিম সা. বলেছেন— কারও বিপদে খুশি হলে আল্লাহ তায়ালা তার দোষ গোপন রাখবেন না। আমাদের এই কথাটি বেশ ভালো করে বুঝে নেয়া উচিত যে, সন্তানদের এই মন্দ পরিণতি যুবক বয়সে তার মন্দভাষণ ও অন্যদের ধিক্কার দেয়ার ফল হতে পারে। তার সেই বুজুর্গ বন্ধু এটাও বলেন— নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত কঠোর আচরণ করতেন। তাদের কোনো অযাচিত কাজ তিনি কিছুতেই সহ্য করতেন না। ধমকাতেন, মারতেন এবং ক্ষুদ্ধ হয়ে কখনো সখনো তাদের ইবলিস, শয়তান, অভিশপ্ত ও প্রত্যাখ্যাত ইত্যাদিও বরতেন। হতে পারে, তা তক্ষুণি খোদার কাছে মঞ্জুর হয়ে গেছে। এ জন্যেই হয়তোবা আল্লাহ তায়ালা তার সন্তানদের শয়তানের বৈশিষ্ট্যধারী বানিয়ে দিয়েছেন। কেননা, সন্তানদের ব্যাপারে মা-বাবার দোয়া যেভাবে দ্রুত কবুল হয়, একইভাবে বাবা-মার বদ দোয়াও সন্তানদের বেলায় দ্রুত কার্যকর হয়ে দেখা দেয়। তাই কখনো মনের ভুলেও, রাগে ও উত্তেজিত হয়েও নিজের সন্তানদের ধমকানোর ক্ষেত্রে গলদ নামে ডাকা উচিত নয়। এমনও হতে পারে সেটাই কবুল হওয়ার সময় এবং তার প্রভাব প্রকাশ পেয়ে গেলো। তিনি যদি তার সন্তানদের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর নির্দেশিত নীতিমালা পালন ও দোয়া-প্রার্থনার মাধ্যমে নিজের সন্তানদের প্রতিপালন করতেন এবং অন্য কারও সন্তানকে খারাপ না বলতেন, সম্ভবত তাহলে এমন দুর্দিন তাকে দেখতে হতো না। আল্লাহর কাচে আমাদের প্রার্থনা করা উচিত— হে আল্লাহ, আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা বয়ে আনে এবং আমাদের খোদাভীরুদের নেতা বানান। সূত্র : বিখরে মোতি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১১০১ লেখক : মাওলানা ইউনুস পালনপুরি রহ. অনুবাদ : মাওলানা মনযূরুল হক
ক্লান্তি ও ঘুম নিয়ে নামাজ আদায় করার বিধান
সবশেষে বলি, আমাদের উচিত নামাজসহ সকল ইবাদতে প্রাণচাঞ্চল্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট থাকা। কেননা নামাজে একাগ্রতা অবলম্বন করার মাধ্যমেই বান্দার সঙ্গে মহান মাবুদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসুল (সা.)-এর শিখানো পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন। মুসলমানদের জন্য নামাজ আদায় ফরজ। নামাজ শারীরিক ও আত্মিক ইবাদাত। মহানবী (সা.) ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। নামাজসহ ইবাদত বন্দেগিতে যখন ক্লান্তি চলে আসবে তখন বিশ্রাম গ্রহণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন মহানবী (সা.)। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) একবার মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন, একটি রশি দুটো খুঁটির মাঝখানে বাঁধা আছে। তিনি বললেন, ‘এ রশিটা কিসের জন্য?’ সাহাবিগণ বললেন, ‘এটা জয়নবের রশি।’ তিনি যখন নামাজ পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন এ রশিতে ঝুলে থাকেন।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘এটা খুলে ফেল। তোমাদের প্রত্যেকের উচিত উদ্যম সহকারে নামাজ পড়া। আর যখন ক্লান্ত হয়ে যাবে তখন ঘুমিয়ে পড়বে।’ (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস পাঠে আমরা যে শিক্ষা লাভ করি- ১. এ হাদিসে মধ্যমপন্থা অবলম্বন না করে নিজের প্রতি কঠোরতা আরোপ করার একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হজরত জয়নব (রা.) নিজের নিদ্রাভাব দূর করার জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন; যেন তিনি বেশি করে নামাজ আদায়ে সক্ষম হন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর এ কাজকে অনুমোদন দেননি। তিনি (সা.) তাঁর উম্মতকে মধ্যমপন্থা অবলম্বন ও কঠোরতা পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ২. যখন কারো নিদ্রা আসে তখন নিদ্রা যাওয়াটা হলো তার কর্তব্য। নফল নামাজের জন্য নিজেকে এতটা কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। ৩. অনেককে দেখা যায় নামাজের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেও নামাজ অব্যাহত রাখেন। এরূপ করা ঠিক নয়। ঘুমের ঘোরে নামাজ, প্রার্থনা বা ইবাদাত-বন্দেগি করতে নিষেধ করা হয়েছে। ৪. নামাজ পড়তে পড়তে যখন ঘুম চলে আসে, তখন মুমিন বান্দার ঘুমও নামাজের ন্যায় ইবাদতের শামিল। সবশেষে বলি, আমাদের উচিত নামাজসহ সকল ইবাদতে প্রাণচাঞ্চল্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট থাকা। কেননা নামাজে একাগ্রতা অবলম্বন করার মাধ্যমেই বান্দার সঙ্গে মহান মাবুদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসুল (সা.)-এর শিখানো পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন। ফয়জুল আল আমীন [ফয়জুল আল আমীন- ধ্রুপদী এক লেখক। পুরো নাম- সৈয়দ মুহম্মদ ফয়জুল আল আমীন। প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কলাম, সাহিত্য সমালোচনা, গল্প, গবেষণা, কবিতা, ছড়াসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় যার সুদীপ্ত বিচরণ। দেশের প্রথম শ্রেণির প্রায় সব দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও ছোটকাগজে নিয়মিত লিখছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর গুরু হলেন বাবা। আর সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে প্রকৃতি। ইসলাম ধর্মের নানা দিক ও বিষয় নিয়ে সুদীর্ঘ গবেষণা করেছেন ফয়জুল আল আমীন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় রিপোর্টার, ফিচার লেখক, সাব-এডিটর, সহযোগী সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। একাধিক প্রকাশনা সংস্থায় সিনিয়র লেখক, সম্পাদক ও আরঅ্যা-ডি’র প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে পাঠকপ্রিয় একটি সাপ্তাহিকে চিফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।]
দ্রব্য মূল্য নিয়ন্তণে ইসলামি দিক নির্দেশনা
দ্রব্যমূল্য কেন বাড়ে এ প্রশ্নের জবাবে মৌলিকভাবে দুইটি কারণ উল্লেখ করা হয়। ১. ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। ২. মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত লালসা। এছাড়াও প্রাসঙ্গিক কিছু কারণ রয়েছে। যেমন- আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, শুল্ক বৃদ্ধি করা, বাজার নিয়ন্ত্রণ দ্রব্যমূল্য কেন বাড়ে এ প্রশ্নের জবাবে মৌলিকভাবে দুইটি কারণ উল্লেখ করা হয়। ১. ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। ২. মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত লালসা। এছাড়াও প্রাসঙ্গিক কিছু কারণ রয়েছে। যেমন- আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, শুল্ক বৃদ্ধি করা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের অমনোযোগিতা ও ব্যর্থতা, শিল্প মালিক, উদ্যোক্তা, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি ইত্যাদি কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। তবে এসব কারণ সরকার আন্তরিক হলে দমন করা সম্ভব। এক শ্রেণীর অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারও বিভিন্ন সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেটকেই দায়ী করে থাকে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ভোক্তারা। তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় ইসলাম দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এমনসব কালজয়ী, কল্যাণধর্মী, সুচিন্তিত নীতিমালা ও সুদূরপ্রসারী বাজার পরিকল্পনা দিয়েছে যা বাস্তবায়িত হলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যস্ফীতি রোধ এবং সর্বোপরি বাজারের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ও অস্থিতিশীলতা দূর করা সম্ভব। 'ইহতেকার', 'বায়উল হাজিরি লিল বাদি', 'বায়উন কাবলাল কাবজ', 'বায়উ মা-লাইসা ইনদাল ইনসান', 'বায়উল কালি বিল কালি', 'তালাক্কীয়ে জালাব' ইত্যাদি বিধানগুলো মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য। সবার আগে আলোচনা আসে ইহতেকার বা স্টকের। পর্যাপ্ত পণ্যদ্রব্য থাকা সত্ত্বেও অধিক মুনাফার আশায় কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে ভোক্তাদের কষ্ট দেয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ ধরনের লোকের ইবাদত কবুল হয় না বলে হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। স্টককৃত দ্রব্য সরকার নিজের জিম্মায় নিয়ে বিক্রি করে দেয়ার এখতিয়ার সংরক্ষণ করে। হজরত মা'মার ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ফাজালা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, 'পাপাচারী ছাড়া অন্য কেউ মজুদদারি করে না।' (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে আছে, 'যে ব্যক্তি ৪০ রাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুদ রাখে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকে না।' 'বায়উন কাবলাল কাবজ' (পণ্য হস্তগত করার আগে পুনরায় বিক্রি), 'বায়উ মা-লাইসা ইনদাল ইনসান' (মালিকানা হাসিলের আগেই বিক্রি), 'বায়উল কালি বিল কালি' (নামে মাত্র বিক্রি) ইত্যাদি বেচাকেনাগুলো ইসলাম হারাম ও নিষিদ্ধ করে মূলত মধ্যস্বত্বভোগকে নিরুৎসাহিত করেছে। কারণ অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কারণেই পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ইসলাম এ ধরনের লালসার কঠোর বিরোধী। এ প্রসঙ্গে হাদিসে রয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) স্বল্পমূল্যে কেনার জন্য বহিরাগত বিক্রেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করেছেন। (তিরমিজি)। 'বায়উল হাজিরি লিল বাদি' ও 'বায়উন কাবলাল কাবজ'কেও নিষিদ্ধ করেছে। এ দুইটি বেচাকেনার মূল কথা হলো, পণ্যের মালিক বা তেজারতি কাফেলা শহরে পৌঁছার আগেই তাদের কাছ থেকে অধিক মুনাফার লোভে পণ্য কেনা এবং তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের মূল বাজারে উঠতে বাধা প্রদান বা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদের মালামাল কৌশলে বা জবরদস্তিমূলক খরিদ করে পাইকারি বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার করা। এ ধরনের বেচাকেনায় সাধারণ ক্রেতা ও ভোক্তাদের স্বার্থ বিনষ্ট হয় এবং দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। সাধারণত গ্রামবাসী অনেক খাদ্যের উৎপাদনকারী। গ্রামবাসী সরাসরি শহরে এসে সেসব খাদ্য বিক্রি করলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং শহরবাসীকে উচ্চমূল্য দিতে হয় না। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা গ্রামবাসীর কাছ থেকে নিয়ে নিজেরা দালালি করে বাজারদর বাড়িয়ে ফেলে। তাই ইসলাম এ দুই বেচাকেনাকে নিষিদ্ধ করেছে। তাবরানি শরিফে বর্ণিত রয়েছে, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি মূল্য বৃদ্ধির অসদুদ্দেশ্যে মুসলমানদের লেনদেনে হস্তক্ষেপ করে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে আগুনের হাড়ে বসিয়ে শাস্তি দেবেন।' (তাবরানি, ৮/২১০)। অন্য একটি হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, 'কোনো শহরবাসী কোনো গ্রামবাসীর পক্ষ হয়ে বিক্রি করবে না। মানুষকে তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দাও, যেন আল্লাহ তায়ালা তাদের একের দ্বারা অন্যের রিজিকের ব্যবস্থা করেন।' (তিরমিজি)। বর্তমানে এ ধরনের অভিযোগ ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী কর্তৃক স্বল্পমূল্যে খরিদ করে পাইকারি বাজারে তাদের ইচ্ছানুযায়ী উচ্চমূল্যে বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক সুদখোর লোক দাদন ব্যবসার মাধ্যমে কৃষকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে আগে থেকেই তাদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য খরিদ করে নিয়ে থাকে অথচ ইসলামের এ বিধানগুলো যদি লঙ্ঘিত না হতো তাহলে তৃণমূলের উৎপাদনকারীরা নির্বিঘ্নে পাইকারি বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেত। এতে একদিকে দ্রব্যমূল্য সাধারণ আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে থাকত এবং কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পেত। ইসলামী শরিয়তের বিধান হচ্ছে, সাধারণত সরকার পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেবে না। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, 'রাসুল (সা.) এর যুগে একবার দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেল। লোকেরা বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিন। রাসুল (সা.) বললেন, মূলত আল্লাহ তায়ালাই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকারী, রিজিক সঙ্কীর্ণকর্তা, প্রশস্তকর্তা ও রিজিকদাতা। আমি আমার রবের সঙ্গে এভাবে সাক্ষাতের আশা রাখি যে, তোমাদের কারো যেন আমার বিরুদ্ধে রক্ত বা সম্পদ, কোনো বিষয়ে কোনোরূপ দাবি না থাকে।" (তিরমিজি, ১/২৪৫, আবু দাউদ)। এ হাদিসের পরিপ্রেক্ষিতেই ফকিহরা বলেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে সরকার পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেবে না; তবে ব্যবসায়ীরা যদি অতিরিক্ত মূল্য নেয় এবং এতে যদি জনসাধারণের ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তাহলে সংশিষ্ট বিজ্ঞজনদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সরকার দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। সর্বসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবের উদ্দেশ্যে সরকারের এমন পদক্ষেপ কল্যাণকর বলেই বিবেচিত হবে। (হিদায়া, আলমগীরি)। দ্রব্যমূল্য নির্ধারণের নীতিমালা বর্ণনা করতে গিয়ে 'বাহরুর রায়েক' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, 'সরকার যখন দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করতে চাইবে, তখন সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারের গণ্যমান্য লোকদের একত্রিত করবে। ক্রেতাসাধারণকে সরকার উপস্থিত করবে। বিক্রেতারা কী দামে বিক্রি করছে এবং ক্রেতারা কী দামে কিনছে, তা জিজ্ঞেস করে সত্যাসত্য যাচাই করবে। উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের যাতে ক্ষতি না হয়, আবার ক্রেতাসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার সীমাও যেন ছাড়িয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে মূল্য নির্ধারণ করে দেবে। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি তাকি উছমানী এ প্রসঙ্গে লিখেছেন যে, ফকিহরা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ব্যবসায়ীরা যেন যোগসাজশ করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে, সেদিকে সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যদি তারা পরস্পর যোগসাজশে মূল্যবৃদ্ধি করে, তাহলে মুসলিম সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করতে পারবে, যাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। (তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম, ১/৩১২)। লিখেছেন : মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব সৌজন্যে : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ
ফজরের নামাজ পড়তে ওঠার ১০ টি কার্যকরি টিপস
অনেকেই ফজরের আজানের পরও ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারেন না। অলসতা বা অন্য কোনো কারণে ঘুম ভাঙতে চায় না। পরে বেলা উঠে যাওয়ার পর ঘুম ভাঙলে আফসোস হয়, হায়, নামাজটা পড়া হলো না। দেখা গেলো, তিনি ফজরের নামাজ অধিকাংশ সময় কাজা আদায় করেন। অনেকেই ফজরের আজানের পরও ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারেন না। অলসতা বা অন্য কোনো কারণে ঘুম ভাঙতে চায় না। পরে বেলা উঠে যাওয়ার পর ঘুম ভাঙলে আফসোস হয়, হায়, নামাজটা পড়া হলো না। দেখা গেলো, তিনি ফজরের নামাজ অধিকাংশ সময় কাজা আদায় করেন। যারা নামাজের প্রতি ভালোবাসা রাখেন তারা সবাই বুঝতে পারেন যে, কাজটা ভালো হচ্ছে না। কিন্তু হয়ে উঠছে না যে। তাদের জন্যে এই আলোচনা আশা করি বেশ উপকারী বিবেচিত হবে। ফজরের নামাজ পড়তে ওঠাটা আসলে যে খুব কঠিন, তা কিন্তু নয়। এজন্য আপনাকে কয়েকটি কাজ করতে হবে- ১. মনোবল দৃঢ় করতে হবে। অর্থাৎ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, আমি অবশ্যই ফজরের নামাজ আদায় করব। ২. বেশি দেরি করে ঘুমানো চলবে না। আমরা অনেক সময় অনর্থক ঘুমাতে দেরি করি। ঘুমাতে যাই, প্রায় দুপুর রাতে। এর কারণেই ফজরের সময় ঘুম থেকে ওঠা কঠিন হয়ে যায়। ৩. মোবাইলে বা টেবিল ঘড়িতে অ্যালার্ম সেট করে রাখুন। আজকাল মোবাইলে রিমাইন্ডার সিস্টেমে থাকে, যাতে টেক্স করে লিখে রাখুন, ‘নামাজের সময় হয়েছে’ বা এ জাতীয় কিছু একটা। ৪. এলার্ম শোনার পরে ‘আর একটু ঘুমিয়ে নিই’ এই মনোভাব ত্যাগ করুন। ৫. যদি দেখা যায় যে, তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চান, কিন্তু ঘুম আসছে না, তবে কিছুটা দৈহিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করে নিতে পারেন। এর ফলে ক্লান্তির কারণে ঘুম তাড়াতাড়ি আসে। ৬. বাসার বা পাশের ফ্লাটের যিনি নিয়মিত ফজরের নামাজ আদায় করেন, সংকোচ না করে তাকে বলে রাখুন যে, তিনি যেনো কষ্ট করে আপনাকে ডেকে দেয়। এটা বেশ কার্যকর পদ্ধতি। ৭. নিজেকে বলুন, ফজরের নামাজ অন্যান্য নামাজের মতই ফরজ এবং এর গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রে আরো বেশি। সুতরাং এ ক্ষেত্রে উদাসীনতার কোনো সুযোগ নেই। ৮. ঘুমাতে যাবার সময় মৃত্যুর কথা ভাবুন। ভাবুন, যদি নামাজ না পড়া অবস্থায় আপনার মৃত্যু হয়, তাহলে কী কঠিন পরিণতি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। ৯. নিজের ভেতর থেকে অলসতা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে একজন চিন্তাশীল, দায়িত্ববান ও স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। তুলনা করে দেখুন, উন্নত বিশ্বের লোকেরা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে আর আমরা দেরিতে উঠছি। যার ফলে সময়ের বরকত হারিয়ে ফেলছি আমরা। হাদিসে আছে, সকালের ঘুম রিজিকের সঙ্কট তৈরি করে। ১০. রাতের যেসব কাজ আপনাকে ঘুমাতে যেতে দেরি করায়, সেগুলো সকালে করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। তাতে আপনি দারুণ অনুভূতি পাবেন। কেননা, সকালের বাতাসের গন্ধ এতো সুন্দর যে, সে অভিজ্ঞতা বোঝাবার নয়। মাওলানা মনযূরুল হক
